শুক্রবার  ২৮শে জুলাই, ২০১৭ ইং  |   শুক্রবার  ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

ফারাক্কার গেট খুলে দেয়ায় পদ্মা ও মহানন্দার পানি বিপদসীমার কাছাকাছি, ডিসির এলাকা পরিদর্শন:শিবগঞ্জে পানি বন্দি ৭০ সহস্রাধিক মানুষের মানবেতর জীবনযাপন

আগস্ট ২৭, ২০১৬

পদ্মা ও মহানন্দার পানি বিপদসীমার কাছাকাছি

রিপন আলি রকি/চাঁপাইনবাবগঞ্জ/
পদ্মা ও মহানন্দায় হঠাৎ পানি দ্রুত বেগে বৃদ্ধি পাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে ইতোমধ্যেই প্লাবিত হয়েছে। আর পানি বন্দি রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। ফলে ওই সব ইউনিয়নের স্কুল-মাদ্রাসা ও কলেজ সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বন্যার ফলে ফসলের মাঠে থাকা পাকা আধাপাকাও ফসল তলিয়ে গেছে। আর বন্যার পানিতে ডুবে দুর্লভপুর ইউনিয়নের নামো জগন্নাথপুর গ্রামের সানাউল্লাহ নামক ৮ বছরের ১ শিশু মারা গেছে।

জানা গেছে, ভারত সরকার বিহারে রাজ্যের ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতি সামলাতে ফারাক্কার ৯৯টি গেট খুলে দেয়ায় উজান থেকে নেমে আসা পানিতে পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে বিপদসীমার কাছাকাছি চলে গেছে বন্যার পানি। ফলে প্ল¬াবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। দ্রুত বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে অনেক এলাকার মানুষই ইতোমধ্যেই পানি বন্দি হয়েছেন। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন উচু রাস্তায় বা শহরে কোন স্বজনের বাড়িতে, কেউ খোলা আকাশের নিচে। গত কয়েকটি দিন থেকে ওই এলাকার পানি বন্দি মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাব সহ খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ইতোপূর্বে পাঁকা ইউনিয়নের ৩টি ওয়ার্ডের ১০ গ্রামের ১ হাজার পরিবারের ভিটেমাটি, ৬ টি জামে মসজিদ, ৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। টিউবওয়েলগুলি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরমভাবে দেয়া দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট। পানি বন্দী লোকজনের মাঝে দেখা দিয়েছে ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও গো-খাদ্যের চরম সংকট। মানবেতর জীবনযাপন করছে পানি বন্দী বন্যা কবলিত এলাকার লোকজন। অধিকাংশ বিদ্যালয় রয়েছে বন্ধ। এদিকে উপজেলার মনাকষা, দূর্লভপুর, পাকা, উজিরপুর ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়ন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ওই সব ইউনিয়নে প্রায় গ্রামে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

পাঁকা ইউনিয়নের সাবেক ওয়ার্ড সদস্য মোঃ মতিউর রহমান জানান পাঁকা ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ড এলাকার ভোটার রয়েছে চরলক্ষীপুর গ্রামে। এ গ্রামে বসবাস করে অন্তত ৫৫০ পরিবার। এখানে রয়েছে ৫ টি মসজিদ ও ১ টি সরকারী প্রাতমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এ গ্রামের ২ দিকেই নদী। ৩ দিন থেকে চরমভাবে নদীতীর চরমভাবে ভাঙ্গন শুরু হওয়া ২০ টি পরিবার শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত বাড়িঘরের আসবাব ও জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছে।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, আমার ইউনিয়নের বোগলাউড়ি, চরকানছিড়া, ডাক্তারপাড়া, লক্ষীপুর, চরলক্ষীপুর, কদমতলা, নিশিপাড়া, কটাপাড়া, আইনাল হাজি পাড়া, ২০ রশিযা, ১০ রশিয়া, হলদে পাড়া, পোড়া পাড়ার প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে গত ৫ দিন যাবত। এসব এলাকার অধিবাসীদের অনেকেই মাচা ও টং তৈরী করে কোন রকমে বাস করছে। গবাদি পশু রাখা ও তাদের খাবার নিয়ে পড়েছে তারা চরম বিপদে। বানভাসি মানুষদের মধ্যে বেশীর লোকজনেরই হাতে নেই নগদ টাকা ও খাদ্য। বর্তমানে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ৩৫ বিঘা আউশ ধান। তিনি আরো জানান, আমার ইউনিয়নের ৭০ শতাকাংশ পরিবারের বাড়িঘর পানিতে প্ল¬াবিত হয়ে গেছে। তবে, তাদের সাহায্যের জন্য তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
দুর্লভপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজিব রাজু জানান, গত ২৪ ঘন্টায় দ্রুত বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দূর্লভপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাইপাড়া, মনোহরপুর, ঘুঘুডাঙ্গা, ডাকাতপাড়া, হাসানপুর খাগচাপাড়া, সোনাপুর, নামোজগনাথপুর, দোভাগী, আইয়ুব বিশ্বাসের গ্রাম সহ প্রায় ৮/১০টি গ্রাম পানির নীচে তলিয়ে গেছে। এতে গ্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানি বন্দি ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া বিশেষ করে মাঠে থাকা অর্থকারী ফসল হলুদ পানির নীচে তলিয়ে গেছে। এতে সাধারণ কৃষকরা ব্যপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তিনি আরো জানান, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৯শ বাড়ীঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে এবং প্রায় ১০ একর জমি ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ত্রাণের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানিয়েছি।

অন্যদিকে, মনাকষা ইউনিয়নের রাঘববাটি, হঠাৎপাড়া. তারাপুর, ঠুঠাপাড়া, মুন্সিপাড়া, শিংনগর, চরশিংনগর, ভবানীপুর, শ্যামপুর, চরহাঙ্গামীসহ প্রায় ১০/১২টি গ্রামের প্রায় ১৫/২০ হাজারের মত মানুষ বন্যার পানিতে বন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এব্যাপারে পানি বন্দিরা জানায়, প্রতিবছর বন্যা পানি আমাদের এলাকায় প্রবেশ করে। কিন্তু অন্য বছরের চেয়ে এবছর ব্যাপক বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আমাদের চাষকৃত ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। এমনকি আমরা বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের কেউ এখন পর্যন্ত কোন সহযোগিতা করতে আসেনি। এছাড়া বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্যহিত হচ্ছে পাঠদান।
উপজেলা কৃষি অফিসার আমিনুজ্জামান জানান, এ মৌসুমে উপজেলায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে হলুদের ও ১৯ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। অনেক জমিতেই প্রায় ধান কাটা হয়ে গেছে, তবে বন্যা আরো বাড়লে হলুদের জমিতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার শুক্রবার বিকেলে জানান, শিবগঞ্জ উপজেলা পদ্মা ও মহানন্দা নদীতে বন্যার পানি শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত পদ্মায় বিপদ সীমার দশমিক ১৮ সেন্টিমিটার ও মহানন্দা নদীতে দশমিক ২২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস.এম আমিনুজ্জামান জানান, শিবগঞ্জে পাঁকা ও দূলর্ভপুর ইউনিয়নে বন্যা কবলিত এলাকায় ধান ও পাটের তেমন ক্ষতি হয়নি।

এদিকে শনিবার বিকেলে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মোঃ জাহিদুল ইসলাম। এসময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবু জাফর, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তা মোঃ মুনসুর উর রহমান, শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ ইরতিজা আহসান ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কায়সার মোহাম্মদ প্রমূখ। জেলা প্রশাসক পরিদর্শনকালে বন্যা কবলিত পাঁকা ইউনিয়নের কটাপাড়া গ্রাম কদমতলা গ্রামের ২ শতাধিক পরিবারকে এক হাজার টাকা করে ত্রান হিসেবে প্রদান করেন।

শনিবার ২৭শে আগস্ট,২০১৬ ইং/১২ই ভাদ্র, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ