মঙ্গলবার  ২৪শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং  |   মঙ্গলবার  ১১ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

পদ্মা-মেঘনার প্রবল স্রোতে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে ছুটছে আশ্রয়ের খোঁজেঃবাড়ছে ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা

জুলাই ৩০, ২০১৬

পদ্মা-মেঘনার প্রবল

মাজহারুল ইসলাম অনিক/ 
উত্তাল পদ্মা মেঘনার ভয়ংকর নদী ভাঙ্গনের  কবলে পরে চাঁদপুর সদর উপজেলার ১৪ নং রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে ছুটছে আশ্রয়ের খোঁজে দিকবি দিক। ছেলে সন্তান ও গবাদি পশু সহ ভাঙ্গন কবলিত ক্ষতিগ্রস্থরা পরিবারগুলো নানা চিন্তায় অসহায় হয়ে পড়ছে । নতুন করে মাথা গোজার ঠাঁই তৈরি এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রশাসনসহ সকলের সাহায্য সহযোগীতা তারা কামনা করেন ।

২৮ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় সরজমিন প্রতিবেদনে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা মেঘনার ভয়ংকর ভাঙ্গনে    রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের গোয়ল নগর চোকদার কান্দি, ৬ নং ওয়ার্ডের লগ্গিমারা চরের বেপারী কান্দি ও বালিয়ার চরের দেওয়ান কান্দি এ ৩টি ওয়ার্ড প্রায় সম্পূর্ণ ভাঙ্গনের কবলে পরেছে। আশপাশের আরোও কয়েকটি ওয়ার্ড ভাঙ্গনের কবলে পরতে শুরু করেছে। ইউনিয়নের বাসিন্দারা অনেকে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছে। আবার অনেকে এখনো নতুন ঠিকানা খুজে না পাওয়ায় কি করবে কিছু ঠিক করতে পারছে না।

৭,৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মহিলা মেম্বার শাহিদা বেগম জানান, আমি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত। ছোট বাগাদির বালিয়ার চরের একজন বাসিন্দা। এ এলাকায় ১০ বছর যাবৎ বসবাস করছি। নদীর ভাঙ্গনের কারনে এখন বাড়ি হুমকিতে পড়েছে। এর পূর্বে আমি ইউনয়নের চৌকদার কান্দি এলাকায় গোয়াল নগর চরে ৫ নং ওয়ার্ডে ১৩ বছর বসবাসরত ছিলেন। সেখানে নদীতে ভাঙ্গনের ফলে এ স্থানে এসে বসতি স্থাপন করি।
মেম্বার শাহিদা আরো জানান, ২ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে এখন কি করবো বা কোথায় গিয়ে উঠবো সে বিষয়ে চিন্তায় পড়ে গেছি।

ছোট বাগাদির কৃষক চাঁন মিয়া জানান, এ চরে ৭ বছর বসবাস করছি। এর পুর্বে তিনি জাহাজমারা চরে পরিবার নিয়ে বসবাস করতাম। এখন নদী ভাঙ্গনের কবলে পরে পুণরায় জাহাজ মারা চরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু তার হাতে এখন নগদ অর্থ নেই। সেই সাথে ৪ মেয়ে ও ১ ছেলে স্ত্রী নিয়ে যাতায়াত ও খাবার নিয়েও চিন্তায় রয়েছি।

স্থানীয় আরোও কয়েকজন জানান, ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ মৎস্য আহরন, গরুর দুধ বিক্রি ও কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ড বেশ কয়েকবার নদী ভাঙ্গনের কবলে পরে। এ নদী সরাসরি রাজরাজেশ্বর ইউনয়নে আঘাত হানার কারনে নদীর ভাঙ্গনে দু ভাগে বিভক্ত হয়ে এক ভাগ মেঘনায় ও অন্যভাগ পদ্মা নদীতে প্রবাহিত হয়। এতে করে চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ কিছুটা হলেও রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের কারনে রক্ষা পাচ্ছে। যদি কোনভাবে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন বিলীন হয়ে যায় তাহলে চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ ও পুরাণ বাজার পুরোপুরি হুমকীর মুখে পরবে।

নদীভাঙ্গনের কবলে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের ৩ টি ওয়ার্ড অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ওয়ার্ডগুলো হচ্ছে ৫ নং ওয়ার্ডের চোকদারকান্দি এলাকার গোয়াল নগর, ৬ নং ওয়াার্ডের লগ্গিমারা এলাকার বেপারী কান্দি ও ৭ নং ওয়ার্ডের বালিয়ার চর এলাকার দেওয়ান কান্দি। এছাড়াও রাজরাজেশ্বর ইউনয়নের যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখিন সেগুলো হলো রাজরাজেশ্বর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়, রাজরাজেশ্বর লগ্গিমারা মোজাফ্ফরিয়া দাখিল মাদ্রাসা, বালিয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোয়াল নগর এম ভি কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লগ্গিমারা আশ্রায়ন প্রকল্প, বালিয়া ঢালি কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হুমকীতে রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এ চরটি চাঁদপুর সদর উপজেলা রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নে পরেছে। রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো: মিজানুর রহমান সর্দার জানান, ১৯৮৮ সালে প্রথম এ চরটি মেঘনা –পদ্মার বুকে ভেসে উঠে। এরপর ১৯৮৯-৯০ এর মাঝামাঝি সময়ে চরটি মেঘনা পদ্মায় আবার বিলীন হয়ে যায়। পূণরায় ১৯৯৮ সালে আবার একই স্থানে জেগে উঠে রাজরাজেশ্বর চর। এরপর লোকজন বসতি স্থাপন শুরু করে। চরটির আয়তন ৩৮ বর্গ কি:মি:। মৌজা ৯টি এবং গ্রাম ১৩ টি। বিভিন্ন সময়ে নদীর ভাঙ্গনে চরটি দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পরে। একভাগের কিছু অংশ ২ টি ওয়ার্ড শরিয়তপুর সীমানার সাথে রয়েছে ও অন্যভাগ রাজরাজেশ্বর চর নামে পরিচিতি পায়। এ চরে মোট লোকসংখ্যা রয়েছে ১৮ হাজার ৯৬ জন। এদের মধ্যে ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ২শ। এ চরে মোট ৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১ টি কমিউনিটি বিদ্যালয়, আরো ২টি কমিউনিটি বিদ্যালয় চলমান রয়েছে, ১ টি উচ্চ বিদ্যালয়, ১ টি দাখিল মাদ্রাসা, ১ টি এবতেদায়ী মাদ্রাসা, ৩ টি এমদাদিয়া দাখিল মাদ্রাসা, ১টি সাইক্লোন সেন্টার, ৮টি ঈদ গা, ৪০ টি মসজীদ, পোষ্টঅফিস ১ টা, আশ্রায়ন প্রকল্প রয়েছে ১ টি ও কবরস্থান রয়েছে ১ টি।

রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান হজরত আলী বেপারী জানান, চলতি ইউনিয়ন নির্বাচনে এ এলাকার জনগনের ভোটে রায় পেয়ে নির্বাচিত হয়েছি। নির্বাচিত হওয়ার পর পরই বর্ষার আগমন। বর্ষার শুরুতেই ৩ টি ওয়ার্ড নদী ভাঙ্গনের কবলে পরেছে। এ ব্যপারে ি জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যানকে অবহিত করেছি। এ মুহুর্তে ভাঙ্গন কবলিত মানুষদের জরুরী ভিত্তিতে ত্রাণ ও নগদ অর্থের প্রয়োজন। ভিটে মাটি ভাঙ্গনের কবলে পরে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। নতুন করে তাদের অন্যত্র বসতি স্থাপন করার জন্য জরুরী ভিত্তিতে ত্রাণ ও নগদ অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। সঠিক সময়ে ত্রাণ ও নগদ অর্থ দিতে না পারলে ভিটে মাটির সাথে বসতঘরও তলিয়ে যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে তথ্য সেবা কেন্দ্রটি বজ্রপাতে পুরোটাই ক্ষতি হয়ে যায়। ফলে তথ্য সেবা কেন্দ্রটি পূনরায় স্থাপন করতে হবে।

চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি/ ৩০শে জুলাই, ২০১৬ ইং