বুধবার  ২৫শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং  |   বুধবার  ১২ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

দ্রোহ ও সাম্যের বার্তাবাহক কাজী নজরুল

আগস্ট ২৭, ২০১৬

কাজী নজরুল ইসলাম

সাফাত জামিল শুভ/চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি/
‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো, তবু আমারে দেবো না ভুলিতে।’ হ্যাঁ, প্রায় চার দশক আগে ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র (২৯ আগস্ট, ১৯৭৬) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিরতরে অন্য ভুবনে পাড়ি জমান। তবে নিজেকে ভুলতে দেননি। আজ শনিবার সাম্য, দ্রোহ ও চিরতারুণ্যের কবির ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাক শক্তিহারা তার অচেতন জীবনযাপন যেন আমাদের এই স্তম্ভিত ইতিহাসের এক নিবিড় প্রতীকচিহ্ন।

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে নবযুগের উদ্বোধক, নতুন বাণীর বার্তাবাহক, নতুন পথের সন্ধানদাতা, নতুন স্বাদ ও রুচির স্রষ্টা। তাঁর কলমেই বাংলা সাহিত্যে বিষয়-ভাবনায় আধুনিকতার সূত্রপাত, যৌবনের জয়গান রচনা, ভালোবাসার পূর্ণ মানবীয় রূপ উন্মোচন, যুদ্ধদৃশ্য-কবিতার প্রচলন, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা, মানুষের আত্মিক স্বাধীনতা, গণমানুষের কল্যাণ ভাবনা, বিশ্বমানবতাবাদ এবং সর্বধর্ম-সম্প্রীতির প্রবল পক্ষাবলম্বন। তিনি কবিতায়-গানে নতুন যুগের সূচনা করেন। তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যৌবন ও বীর্যবানতার প্রচলন করেন। তিনি চিরযৌবনের প্রতীক। তাঁর কলমে বাংলা ভাষা পেয়েছে (কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়) ‘অরুগ্ণ-বলিষ্ঠ-হিংস্র-নগ্ন-বর্বরতায় অনবদ্য’ প্রকাশক্ষমতা।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের কবি মনের আবেগের অনেকটা জায়গা দখল করে আছেন। তাঁর জীবনটা ছিল সংগ্রামের যার শুরু হয় অভিভাবকহীন অবস্থায়, ফলে তাঁর জীবনের গতি পথটা মসৃণ ও নির্বিবাদ ছিল না। অথচ তাঁর হৃদয় টা ছিল এতই বড় যে, সেই মাপের হৃদয়কে ধারণ করার মত সামাজিক পরিবেশ ছিল তখন একেবারেই অনুপস্থিত।নজরুল সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত অকুতোভয় তেজোদীপ্ত এক জীবন সাধক। তিনি গানের বুলবুল, উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কলমযোদ্ধা। আশৈশব নিদারুণ দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বেপরোয়া এক জীবনসন্ধানী। জীবনসত্য অন্বেষণ করিতে তিনি ছুটেছেন নিরন্তর। তিনি চঞ্চল, অস্থির, কখনওবা দারুণ অভিমানী।

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিরুদ্ধে নজরুল ইসলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও মৌলিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের বিরুদ্ধে তিনি সত্যিই বিদ্রোহ করেছিলেন। সাংবাদিক ও কবি হিসেবে তিনি তার সব কর্ম দিয়ে হিন্দু-মুসলিমদের বোঝাতে চেয়েছেন যে, ধর্মভিত্তিক ঘৃণা হচ্ছে মূর্খতার নামান্তর। তিনি হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্যের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রাখতেন।

একজন সৃজনশীল ব্যক্তির প্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করে। এক, তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্য ও তাতে জীবনের নান্দনিক প্রতিচ্ছবির প্রতিফলন এবং সেসবের স্থায়িত্ব; দুই, ব্যক্তি হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা। নজরুল যুগপৎভাবে দুটিরই অধিকারী। তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আর ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তরঙ্গকে নজরুল তার সাহিত্যে বিপুলভাবে ধারণ করেছেন। সেই সময়ে ধর্মান্ধ মুসলমানদের তিনি পুনর্জাগরণের ডাক দিয়েছেন এবং এক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল একজন বলিষ্ঠ নেতার মতো।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

দারিদ্র্যের অভিশাপকে তিনি রূপান্তরিত করেন শক্তিতে। দারিদ্র্য তাহার নিকট হইয়া উঠিয়াছিল অকুণ্ঠিত প্রকাশের অদম্য সাহস; অন্তর্ভেদী দৃষ্টি এবং বাণী ক্ষুরধার। জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব দেখে তিনি বলেছিলেন, প্রাণের ভেতরের যে সত্য, যে ধর্ম, তাহার উপর কোনো ধর্ম নাই। বজ্র নির্ঘোষে তিনি বলেন, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। আজকের বিদ্যমান বাস্তবতাতেও নজরুল সমানভাবে।
শনিবার ২৭শে আগস্ট,২০১৬ ইং/১২ই ভাদ্র, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ