বৃহস্পতিবার  ২৬শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং  |   বৃহস্পতিবার  ১৩ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর দুরবস্থায় রয়েছে ৭০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবার

আগস্ট ৯, ২০১৬

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী

এম শিমুল খান/ 

‘আমার বয়স প্রায় ৭৫। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখছি। স্বাধীনের পর এই দেশেই থাইক্যা গেছি। কিন্তু এখনো পাই না বয়স্ক ভাতা। দুই মাইয়্যারে বিয়ে দিছি। এখন একা একা থাকি। নির্বাচনের সময় চেয়ারম্যান-মেম্বার প্রার্থীরা সুযোগ-সুবিধার দেওনের কথা কয়। কিন্তু নির্বাচনের পর সুবিধা তো দূরে থাক, কোনো খবরই নেয় না।’ বাড়ির সামনে বসে বাঁশ কাটতে কাটতে এ ভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বুনো সম্প্রদায়ের বয়োবৃদ্ধ চিত্ত কর্মকার।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের ব্যাসপুর ও বিশ্বনাথপুর গ্রামে এ সম্প্রদায়ের ৭০টি পরিবারের প্রায় ৬০০ নারী-পুরুষ ও শিশু এখানে বসবাস করছে। প্রতিবছর আদিবাসী দিবসে তাদের অধিকারের কথা তুলে ধরা হলেও বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। এমনকি আর্থিক অনটনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোতেই পারছে না এখানকার শিশুরা। আর সেই সঙ্গে নিজেদের মাতৃভাষাও হারাতে বসেছে।

জানা গেছে, ব্রিটিশরা এ অঞ্চলের বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে নীল চাষ করতে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের নাগপুর এলাকা থেকে গোপালগঞ্জে নিয়ে আসে বুনো সম্প্রদায়ের ২১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারকে। এখানে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীল কুঠি। কোম্পানির শাসনামলের পরিসমাপ্তি ঘটলে এখানে তারা বসতি গড়ে তোলেন। সেই থেকে এ উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের ব্যাসপুর ও বিশ্বনাথপুর গ্রামে স্থায়ী ভাবে বসবাস তাদের। অনেক ভূ-সম্পত্তির মালিক থাকলেও আর্থিক অভাবে বিক্রি আর অবৈধ দখলের কারণে এর আর কিছুই নেই বললেই চলে। ফলে আদি পেশা কচ্ছপ, লাফারু, কুচে ও বাদুর শিকার বদল করে এখন দিন মজুর, কাঠমিস্ত্রি ও কীর্তন গেয়ে জীবিকা চালাচ্ছে তারা।

তারা হারাতে বসেছে নিজেদের মাতৃভাষা নাগরী ভাষা, কৃষ্টি ও কালচার। স্কুলগুলোতে তাদের নাগরী ভাষা প্রচলন না থাকায় বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা জানে না নিজেদের ভাষা। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ঝরে পড়ছে এ সম্প্রদায়ের শিশুরা।

নেপাল বুনুয়া (৮০) বলেন, এখন আনতে পারলে খাই, না পারলে উপোস থাকতে হয়। আগের মতো এখন আর শক্তি নেই। কোনো কাজ করতে পারি না। বয়স আশি হলেও পাই না বয়স্ক ভাতা।
লক্ষ্মী কর্মকার (৬৮) বলেন, ছেলে মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। যে দিন আয় হয় সে দিন কোন রকমে চালিয়ে নিতে হয়। আর্থিক অনটন আমাদের নিত্যসঙ্গী। বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিয়েও সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছি না।

কাশিয়ানী আদিবাসী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক অসীম কর্মকার বলেন, আমরা মূর্খ ও অশিক্ষিত। এখানে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কোনো মাঠকর্মীরা আসেন না। এ কারণে আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে না পারায় আমাদের জনসংখ্যা বেড়েই চলছে।

একই সংগঠনের সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার বলেন, আমাদের মাতৃভাষা, কৃষ্টি, কালচার বিলুপ্ত হওয়ার পথে। আমরা আমাদের মাতৃভাষা চর্চা ও শেখার সুযোগ চাই। এ জন্য সরকারের কাছে দাবি এখানে যেন একটা স্কুল করা হয়। যেখান থেকে আমাদের শিশুরা মাতৃভাষায় লেখাপড়া করতে পারবে।

কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুনিরুজ্জামান বলেন, এখানে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বুনো সম্প্রদায়ের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তারা যাতে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সব ধরনের সরকারি সুবিধা পায়, এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি/ ৯ই আগস্ট, ২০১৬ ইং