বুধবার  ২৫শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং  |   বুধবার  ১২ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

আহমদ ছফা’র স্বচ্ছ ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গী

আগস্ট ১০, ২০১৬

আহমদ ছফা

সাফাত জামিল শুভ/
চট্টগ্রামে গত সপ্তাহটা একটা জলময় সপ্তাহ গেল।এখানকার বৃষ্টির সাথে পরিচিত থাকায়, রাস্তার বেহাল দশার কথা ভেবে একপ্রকার গৃহবন্দী ছিলাম। বই পড়ে সময় কাটালাম যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আহমেদ ছফার “গাভী বিত্তান্ত” -অদ্ভুত সুন্দর একটা স্যাটায়ার।সময়ের আবর্তনে যা একটি কালজয়ী উপাখ্যানে পরিণত হয়েছে।দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক অবস্থান আর জ্ঞানচর্চার মোড়কের আড়ালে ভেতরকার কদর্য চিত্র এত নিখুঁতভাবে এর আগে কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি।সাধারণ ঘটনার তীর্যক বিশ্লেষণ আর দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমারে ভরা এই বইটি পড়তে পড়তে কিছুক্ষণ পরই ধাক্কা লাগবে, হাসি আসবে, তবে সামগ্রিকভাবে কালো মেঘে ঢেকে যাবে শিক্ষাসচেতন যে কারো মন।

বাংলাদেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে যেসব অনাকাঙ্খিত স্বার্থপরতা ও কলুষিত শিক্ষক রাজনীতি চলে তা আমাদের অনেকের কাছে অজানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতি ,তাদের নীতি আদর্শ থেকে বিচ্যূতি, দলবাজি, জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব, শিক্ষক নিয়োগে নীতি বিসর্জন, শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের স্বজনপ্রীতি ও পরিবাবরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা জানতে আগ্রহী হলে আহমদ ছফা রচিত তার জীবনের অন্যতম সেরা উপন্যাস ” গাভী বিত্তান্ত ” পড়তে পারেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ, সভাপতি ও ডীন নিয়োগ এমনকি হলের আবাসিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও কী পরিমাণ রাজনীতি চলে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন আহমদ ছফা।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, যেখানে শিক্ষক বিদ্যাচর্চায় স্বয়ং প্রবৃত্ত, সেখানেই শিক্ষার্থী বিদ্যাকে প্রত্যক্ষ দেখতে পায়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের শিক্ষকদের বড় অংশ এখন আর বিদ্যাচর্চায় নেই, আমাদের শিক্ষার্থীদেরও বড় অংশ তাই আর বিদ্যাকে দেখতে পায় না।আহমেদ ছফার লেখনীতে এ দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের থেকে তিনি একটু আলাদা ছিলেন,সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর বিভিন্ন লেখা থেকে। বাংলা সাহিত্যের সব কয়টা শাখাতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেছেন এবং শুধু পরিমানগত নয় গুনগত বিচারেও অবদান রেখেছেন। যেমন কবিতাতে “একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা” আধুনিক কবিতাতে তার একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন, তেমনি তাঁর উপন্যাস গুলো প্রত্যেকটি কোন না কোন তাৎপয পূর্ণ অর্থবহন করেছে যেমন “ওঙ্কার” ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা অর্থাৎ সাংস্কৃতিক স্বাধিকারকে উপজীব্য করে রচিত, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লিখেছেন “অলাতচক্র” অপরাপর সমকালীন বাস্তবতাকে সরস ভাষায় তুলে এনেছেন গাভী বিত্তান্ত, “একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন” সহ অনেক উপন্যাস এবং গল্পে।
একজন সফল অনুবাদক হিসেবেও আহমদ ছফা নিজেকে পরিচিত করিয়ে গেছেন । গ্যেটের বিখ্যাত ” ফাউস্ট ” সর্বপ্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন তিনি। ” তানিয়া ” তাঁর আরেকটি প্রশংসনীয় অনুবাদ কর্ম। ফাউস্ট অনুবাদের সময় তিনি জার্মান দূতাবাসের সহায়তা পান।তিনি শিশুদের জন্য “গো হাকিম ” নামের ছড়া লেখেন, কিশোরদের জন্য লেখেন গল্পগ্রন্থ ” দোলো আমার কনকচাঁপা “।

মানুষের স্বাভাবিক কথাবার্তাও যে সাহিত্য হতে পারে আহমদ ছফার সাক্ষাৎ্কারগুলো না পড়লে তা বোঝা যাবেনা । অনেক জটিল বিষয়, বিতর্কিত ব্যক্তি ও তাদের কর্ম, চলতি রাজনীতি,ধর্ম ও দর্শন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলে প্রতিটি সাক্ষাৎকারকে একেকটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে রেখে গেছেন তিনি। জীবিত থাকতেই তাঁর সাক্ষাতকারগ্রন্থ “আহমদ ছফা বললেন…” প্রকাশিত হয়। প্রতিটি সাক্ষাৎকারে তিনি অগ্নিঝরা সত্যের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।

১৯৭২ সালে আহমদ ছফা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক। থাকতেন আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের ২০৬ নম্বর রুমে। কিন্তু আমরা সবাই জানি যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। সম্ভব যে হয়নি, তার পেছনের কারণ তাঁর মেধার ঘাটতি নয়। কারণ হচ্ছে ডিগ্রি অর্জনের তুলনায় সেই সময়ের ডাকে সাড়া দেওয়াটাকে তিনি অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে ভেবেছিলেন। সাঈদ-উর-রহমানের স্মৃতিকথা থেকে আমরা পেয়েছি কারণটি- ‘মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের চাঞ্চল্য তাঁকে কখনো স্থির থাকতে দেয়নি- একটা কিছু করো- সেই আবেগ ও প্রেরণা পিএইচডি করার সামান্য সীমাবদ্ধ বৃত্ত থেকে তাঁকে বাইরে নিয়ে যায়। সংগঠন করা, পত্রিকা বের করা, বই লেখা, সেমিনার করা, প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো ভেঙে বিপ্লবের জন্য নতুনভাবে নির্মাণ করা- ইত্যাকার কাজে ও স্বপ্নে তিনি বিভোর থাকতেন।’

ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত আহমদ ছফা এক বৈচিত্রময় ও সমৃদ্ধ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ১৯৬৭ সালে প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের পরেই অধিকাংশ সাহিত্য রচনা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাংবাদিক বলা যেতে পারে তাঁকে। তাঁর সম্পাদনায় ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা ” প্রতিরোধ” প্রকাশিত হয়।

প্রবল আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন আহমদ ছফা বেঁচে থাকতে কারো প্রত্যয়ন অথবা নিন্দার তোয়াক্কা করতেন না । কলকাতার তথাকথিত বাঙালি বাবুদের এদেশপ্রীতি যে “কেবল নিজেদের বইয়ের কাটতি বাড়ানো” আহমদ ছফাই তা প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন।

অতুতোভায় এই কলমসেনার লেখাগুলো বেশি করে প্রকাশ ও প্রচারে আমাদের পত্রিকা, মিডিয়া ও সাহিত্যিকরা কেন যে খুব উদাসীন, তা বোধগম্য নয় !
” আমার নির্ভীকতা ও সততা একদিন তরুনরা নিজ থেকেই খুঁজে নেবে ” এই সত্য বিশ্বাস করতেন আহমদ ছফা।

সহজ সরল প্রকাশভঙ্গী; প্রতিটি বাক্যই যেন একেকটি পটভূমি; সম্পূর্ণ সৃষ্টিকর্ম মানুষের বাস্তব জীবনের জীবন্ত প্রস্ফুটন এই হচ্ছে একজন আহমদ ছফার লেখার বিশেষত্ব। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে কয়েকজন সাহিত্যিক কালের বিবর্তনে অপরিবর্তিত রয়েছেন তাদের মধ্যে আহমদ ছফা অন্যতম।
চট্রগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন জন্ম হয়েছিল এই মহান সাহিত্যদিশারী ও ৭১’র রনাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধার।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়/ ১০ই আগস্ট, ২০১৬ ইং