শুক্রবার  ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং  |   শুক্রবার  ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

আগামীকাল ফুলবাড়ী ট্রাজেডির ১০ম বার্ষিকী

আগস্ট ২৫, ২০১৬

ফুলবাড়ী ট্রাজেডি

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন/ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি/
আগামীকাল ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবসের ১০ বার্ষিকী।

২০০৬ সালের এই দিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার কয়লা খনি প্রকল্প বাতিল ও বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জির দেশ ত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি চালায় পুলিশ ও বিডিআর (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি)। এতে ৩জনের মৃত্যু হয়।

এসময় প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া পুলিশ-বিডিআরের সঙ্গে সংঘর্ষে ৩ শতাধিক মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন।

এদেরই একজন বাবুল রায়। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ঘটনার পর থেকে তিনি পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এদিকে, এ দিনটিকে ফুলবাড়ীতে দুইটি ব্যানারে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠন ও ফুলবাড়ীবাসীর পক্ষ থেকে এ দিনটিকে ‘ফুলবাড়ী দিবস” হিসেবে পালন করে আসছে। ‘ফুলবাড়ী দিবস” পালন উপলক্ষে দুইটি ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো ব্যাচ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন, সকালে শোক র্যা লি ও স্মৃতি স্তম্ভে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, গান-নাটক, তথ্যচিত্র ।

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট বিকেল ৩টায় উপজেলার ঢাকা মোড়ে এক প্রতিবাদ সভায় এশিয়া এনার্জিকে তাদের সবকিছু গুটিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, নইলে তাদের কার্যালয়ে তালা দেওয়া হবে এমন ঘোষণা দেওয়া হয়। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পূর্ব ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ কর্মসূচি পালিত হয়।

এরপর ফুলবাড়ী শহরে সাধারণ জনতা বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে এশিয়া এনার্জি কোম্পানির অফিসের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে ছোট যমুনা ব্রিজের উপর বিডিআর ও পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফুলবাড়ীর চাঁদপাড়া গ্রামের তরিকুল ইসলাম (২২), বারকোনা গ্রামের শিশু আমিন (১০) ও নবাবগঞ্জ উপজেলার ঝড়ারপাড় গ্রামের সালেকিনের (১৫) মৃত্যু হয়। এসময় গুলিবিদ্ধ হন অন্তত অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী। এছাড়া তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।

এ ঘটনার পরের দিন ফুলবাড়ীর সর্বস্তরের জনতা প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনকারীরা গাছের গুঁড়ি দিয়ে রেলপথ ও রাজপথ বন্ধ করে দেয়। সারা দেশের সঙ্গে ফুলবাড়ীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অচল হয়ে পড়ে ফুলবাড়ী। শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

এদিন বিডিআর ও পুলিশ কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে নারীদের লাঞ্ছিত করে। সকালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জনতার মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ফুলবাড়ী শহর। শহরের সমস্ত দোকানপাট, ব্যাংক-বীমা, অফিস আদালতের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

২৮ আগস্ট সকালে বিডিআর প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা এশিয়া এনার্জির দালালদের বাড়িতে ও অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরে তারা এশিয়া এনার্জির ওয়্যার হাউজ, চারটি প্রদর্শনী বিল্ডিং ও ওভার হেড পানির ট্যাংক ভাঙচুর করে এবং ইট ও লোহার বড় লুট করে নিয়ে যায়।

২৯ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রী খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ও রাজশাহী সিটি মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এমপি জাতীয় কমিটির সঙ্গে আলোচনার জন্য দিনাজপুরে আসেন। কিন্তু সেদিন কোনো আলোচনা হয় না।

পরদিন ৩০ আগস্ট জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মতে পার্বতীপুর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে তিন ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ব্যাপক আলোচনা শেষে এশিয়া এনার্জিকে প্রত্যাহার, হতাহতদের ক্ষতিপুরণসহ ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ছয় দফা চুক্তি করার পর আন্দোলনের সমাপ্তি হয়। সেই থেকে ২৬ আগস্ট দিনটিকে ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

এদিকে ফুলবাড়ী দিবস ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বাস্তবায়ন হয়নি ফুলবাড়ীবাসীর সঙ্গে তৎকালীন সরকারের সম্পাদিত ৬ দফা চুক্তি। এজন্য আন্দোলন কারী সম্মিলিত পেশাজীবি সংগঠন ও তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সে সময় বিরোধি দলে থাকা অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার বাস্তবায়নের জন্য আহবান জানান।

ফুলবাড়ী সম্মিলিত পেশা জীবি সংগঠনের আহবায়ক ও পৌর মেয়র মর্তুজা সরকার মানিক বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০০৬ সালে বিরোধী দলীয় নেতা থাকাকালীন ফুলবাড়ীতে এসে ফুলবাড়ীবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি যদি ক্ষমতায় যান তাহলে ফুলবাড়ীবাসীর সঙ্গে সম্পাদিত ৬ দফা চুক্তি বাস্তবায়ন করবেন। ওই সময় ছয় দফা চুক্তি করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফুলবাড়ী দিবসে ফুলবাড়ীবাসী এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে নতুন করে শপথ গ্রহণ করবে।

তেলগ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহবায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় ২০০৬ সালে ফুলবাড়ীতে এসে ফুলবাড়ীর বীর জনতাকে স্যালুট দিয়েছিলেন এবং ফুলবাড়ীবাসীর সঙ্গে সম্পাদিত ৬ দফা চুক্তি বাস্তবায়নের ঘোষনা দিয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে আজও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেননি। ফলে আবারও এশিয়া এনার্জির কমিশন ভোগী দালালেরা নানাভাবে ফুলবাড়ীবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এজন্য তিনি আইন করে ফুলবাড়ীবাসীর ৬ দফা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এশিয়া এনার্জির দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বৃহস্পতিবার ২৫শে আগস্ট,২০১৬ ইং/১০ই ভাদ্র,১৪২৩ বঙ্গাব্দ