শনিবার  ২৯শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং  |   শনিবার  ১৬ই বৈশাখ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

রান্না ও খাদ্য  ইতিহাসের সাতসতেরো

জুন ২৬, ২০১৬

রান্না

একটি গল্প।রান্নার গল্প।সবচেয়ে প্রাচীণ এবং জীবন ঘনিষ্ট গল্প । এ গল্পের শুরু কবে – শেষ কবে আমরা জানি না । কো্ন দেশ থেকে রান্নার ইতিহাস শুরু হয় তাও আমরা বলতে পারি না। তবে কল্পনা করা হয় আমাদের আদি পিতাদের কথা।তারা জন্মদিনের পোষাক পরে বনে বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে পশু শিকার  করত। কাচা মাংস খেত, এর মধ্যে আগুন আবিস্কার হল । দৈবক্রমে এক শিকারির হাত ফস্কে এক চাপ মাংস আগুনে পড়ে যায়। শিকারী ছিল ক্ষুধার্ত। পোড়া মাংস তুলে খায়। খেয়ে দেখে পোড়া মাংস সহজে চিবানো যায়। কাচা মাংসের উৎকট গন্ধ নেই। খেতে স্বাদ লাগে।সহজে হজম হয়।আবার কেউ বলেন, তারা খেলার ছলে একটি শুকর  জলন্ত আগুনে পোড়া দেয়। পোড়া শুকর এর মাংস খেয়ে খুব মজা পায়।উভয় ঘটানার মধ্যে মিল রয়েছে, আর তা হলো মাংস পুড়িয়ে খাওয়া। মাংস রোষ্ট করে খাওয়ার রেওয়াজ চালু হয়। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এ জনপ্রিয় কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আগুন একযোগে সকল অঞ্চলে আবিস্কৃত হয় নি।আফ্রিকায় আগুন আবিস্কৃত হয় খৃষ্ট পূর্ব ১৪০০,০০০ অব্দে, এশিয়ায় আবিস্কৃত হয় খৃষ্ট পূর্ব ৫০০,০০০ অব্দে, প্রায় কাছাকাছি সময় নেদারল্যান্ডসহ স্ক্যান্ডনোভিয়ান দেশ গুলোতেও আগুন আবিস্কার হয়।তারা আগুন ব্যবহার  শিখে।এসময় একটি সূত্র তৈরী হয়। আদিম মানুষ  ও মানুষের কাছাকাছি কিছু জীব জানোয়ার যেমন শিম্পাঞ্জী, গরিলা ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা হত আগুনের ব্যবহার এর উপর। মানুষ আগুন ব্যবহার করতে পারত কিন্ত জীব জানোয়ার আগুন ব্যবহার করতে পারত না। এখনও পারে না।

 এখন থেকে প্রায় চল্লিশ হতে পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে আগুনের প্রায় সার্বজনীন ব্যবহার শুরু হয়। আগুন জন বসতির নিত্য ব্যবহারিক উপাদান হিসেবে গুরুত্ব লাভ করে। আগুন আবিস্কার এর পর পরই মানুষ পানি গরম করতে শিখে। তারা পাতলা পাথর খোদাই করে পাত্র তৈরি করতে শিখে। পানি গরম করতে শিখে। শুরু হয় ইতিহাসের নূতন পাতা । এ সময় মানুষ মাছ,মাংস,লতা-পাতা সেদ্ধ করে খেতে শিখে।পরবর্তীতে গম, বার্লি,চাল , ভূট্টা, রাই, আলু রান্না করে খাওয়ার প্রধান নিত্য উপকরণ হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

এ সময় মানুষ কাচা খাবার ও রান্না করা খবারের উপকারিতা ও অপকারিতা বুঝতে পারে। কাচা খাদ্য অনেক সময় বিষাক্ত, বদহজমের কারণ বলে তারা জানতে পারে।অন্যপক্ষে রান্না করা খাবার দূষণ মুক্ত, হজম সহায়ক, এবং উন্নত সংস্কৃতির পরিচায়ক হিসেবে গণ্য করা হয়।(Cambridge World History of Food, Kenneth F. Kiple and Kriemhild Conne Omelas, Cambrige University Press, Cambridge, 200 (P.1571).

রান্নার ইতিহাসের পাতায় মেসোপোটিমিয়ানদের সবচেয়ে বড় অবদান । তারা খৃষ্ট পূর্ব ২ হাজার বছর পূর্বেই লিখিত ভাবে খাবার রেসিপি প্রণয়ন করেছেন। মিশরীয়রা ভোজন রসিক জাতি। ধারণা করা হয় খৃষ্টপূর্ব ৩১০০ অব্দ হতে মিশরীয় সভ্যতার গোড়াপত্তন ঘটে।তারা কৃষি প্রধান জাতি হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে।তারা নীল নদকে কেন্দ্র করে প্রচুর চাষাবাদে লিপ্ত হয়। তাছাড়া, নদীতে থাকা মাছ, জল হস্তি, গেজেল তাদের আমিষ পূরণের অবলম্বন ছিল। তাদের খাদ্যের আইটেম ছিল ঠাসা। মূখরোচক করার জন্য তারা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করত। মিরামিড গুলোতে মৃত ফারওগণ যাতে খাদ্য কষ্ট না পায়, সেজন্য সুদৃশ্য পাত্রে প্রচুর পরিমানের খাবার সমাধি ক্ষেত্রে দেয়া হত।মিশরীয়গণ খাবার সংরক্ষণের দিকেও মনোযোগী ছিল। খৃষ্টপূর্ব  ১২০০ব অব্দের দিকে নীল নদের নিম্ন অববাহিকায় খাদ্য সংরক্ষণ রীতি শুরু হয়। তারা মরুর তপ্ত বালিতে কড়া রোদে এবং গরম বাতাসে মাছ, মাংস ও সবজী লবন মাখিয়ে শুটকি করত এবং বিভিন্ন পাত্রে অনেকদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করত। উইলবার স্মিথ রচিত উপন্যাস- রিভার গড (মখদুম আহমেদ অনুদিত, রোদেলা প্রকাশণী) তেও তাদের গেজেল/ জল হস্তি শিকার সংক্রান্ত ধারণা পাওয়া যায়।তবে দূর্ভাগের বিষয়, মিশরীয়গণ যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ের কোন লিখিত খাদ্য রেসিপি লিখে যায় নি।,

স্ক্যান্ডনোভিয়ান দেশগুলোতে ভাইকিংসগণ প্রচুর পরিমাণ খাসির মাংস, ঘোড়ার মাংস, গরু, শুকর, ভল্লুক এর মাংস,তিমি,সীল মাছ খেত।আইসল্যাণ্ডে দানাদার খাদ্য  হিসেবে বার্লি চাষ করা হত। অটোমিল, বার্লি, ডিম, দূধ, ননী, বাটার ও পনির তাদের খাবার তালিকায় থাকত। কড ও বাইং মাছ খেতে তারা খুবি পছন্দ করত।তাদের মধ্যেও খাদ্য সংরক্ষণের রেওয়াজ ছিল।তবে তারা পানি শুন্য করে খাবার ঠান্ডায় জমিয়ে ফেলত এবং দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ করত।ভাইকিংসরা দুবেলা আহার করত। তারা ডাইনিং টেবিলে বসে দলবদদ্ধভাবে খেতে পছন্দ করত । খাবার সময় কাঠের প্লেট, চাকু ও চামচ ব্যবহার করত।বিভিন্ন পালাপর্বনে গৃহিণী টেবিলের উপর  নক্সা করা সাদা লিনেনের কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দিত। খাবার পরিমাণ ও আইটেম থাকত অঢেল।অতিথিরা সারাদিন রান্না করা খাবার এবং মদ খেয়ে আনন্দ উল্লাসে দিন সাবাড় করে দিত ।

চীনে মানুষ প্রাচীণ কালে ধান চাষ করত। খৃষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে এ অঞ্চলের মানুষকে পানিতে চাল সেদ্ধ করে খেতে দেখা যায়। এ ধারা এখনও বিদ্যমান। খৃষ্টপূর্ব .৩০০০ অব্দে চীনে চা আবাদ ও পান করার ইতিহাস দেখা যায়।খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে মধ্য এশি্যা থেকে আগত ব্যবসায়ীরা চীনে গম খাওয়ার প্রচলন করে।তাছাড়া  তাদের মাধ্যমে খৃষ্টপূর্ব ৪০০০- ৩০০০ অব্দে শুকর, মেষ এবং গরু খাওয়া শেখে । ৫৫০০ অব্দে তারা শ্যাম দেশ ( থাইল্যান্ড) থেকে মুরগী খাওয়া শিখে।চীনের বিখ্যাত ঐতিহাসিক সীমা কুইয়েন উল্ল্যেখ করেন যে, খৃষ্ট পুর্ব ১৭৩৬ – ১৭৬০ অব্দে ই ইন নামে দাস পরিবারের একজন জন পাচক  রান্নার গুণে তৎকালীন শাসকের মন জয় করেন এবং তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ে নতুন রাজবংশের প্রথম রাজা  তাঁকে প্রধান মন্ত্রী করেন।তাকে চীনের সবচেয়ে সফল প্রধান মন্ত্রী হিসেবে গণ্য করা হয়। মার্কো পোলো ভেনিস থেকে  কুবলাই খান এর আমলে চীনে আসেন।এ সময় চীনারা রুটি বানানোর জন্য আটা গুলতে জানত না । ১৩৫০ সালে শিল্পী Ni Zan  রুলস ফর ড্রিংকিং এন্ড ইটিং লেখেন।এ বইয়ে সয়া সস, নুডলস,কাকড়া,মাছ, মাশরুম, জেলী ফিস ইত্যাদি রান্নার রেসিপি রয়েছ। জাপানে খৃষ্ট পূর্ব খাদ্যের বড় বেশী তথ্য পাওয়া যায় না।

ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্য বিবর্তিনের ধারা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে,খৃষ্ট পূর্ব ৭০০০ অব্দে ব্যাপক হারে পশু পালন করা হত।খৃষ্ট পূর্ব ৩০০০ অব্দে এ অঞ্চলে ব্যাপক হারে মসলা বিশেষতঃ হলুদ , কালো মরিচ এবং সরিষার  চাষ শুরু হয়। এ অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক সংখ্যক অনুসারী থাকায় পশু বিশেষতঃ গরু কম খাওয়া হয়। উপমহাদেশে খাবার এর উপর আরবীয়, মধ্য এশীয় এবং মোগলদের প্রভাব দেখা যায়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের খাদ্যের মধ্য অনেক পার্থক্য দেখা যায়।তবে হায়দ্রাবাদের নিজাম বিরানী রান্নার যে রীতি চালু করেন তা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় এবং সকলের জন্য সমাদৃত হয়ে আজও টিকে আছে। মোগলদের শাহী খাবারের সুনাম বিখ্যাত।ইংরেজ ও পূর্তগীজদের দ্বারা ইউরোপ থেকে রন্ধনের অনেক কৌশল আমদানী হয়।ভারতের প্রায় এক তৃতিয়াংশ লোক নিরামিষভোজী।

বৃটেন এর নরম্যানগণ মূলতঃ স্ক্যান্ডোনোভিয়ান দেশ থেকে   নবম শতকে  বৃটেনে আগমন শুরু করে।তারা ইংল্যান্ড বিজয় করে এবং  ১০৬৬ সালে নরম্যান্ডির ডিউক, উইলিয়ামকে রাজা বানায়।স্ক্যান্ডোনোভিয়ানগণ উচ্চাভিলাষী ছিল। তারা যে কোন সংস্কৃতি সহজেই রপ্ত করত। তারা ফ্রান্স, সিসিলি,ইংল্যান্ড, উত্তর আফ্রিকার সংস্কৃতি ধারণ করে এবং তাদের  খাদ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে এর প্রভাব দেখা যায়। ইংল্যান্ডে খাদ্যে তাদের প্রভাব প্রকট । ১২৮০  সালের পূর্বে তাদের নিকট লিখিত খাদ্য রেসিপি পাওয়া যায়।

প্রাচীণকাল থেকেই দেখা যেত অভিজাত শ্রেণী যে ধরণের খাবার খেত সাধারণ মানুষ সে  ধরণের খাবার পেত না । এমন কি নূন্যতম পুষ্টি চাহিদা মিটত না। ১২ শতকে রাজা রিচার্ড এর সময়  ধনীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে রবিনহডকে  গরীবদের জন্য  খাবার জোগাড় করতে দেখা যায়।

আমরা বন্ধন ও খাদ্যের বিবর্তনের সাথে দেখতে পাই খাদ্য প্রস্ততের যন্ত্রপাতির আধুনিকতা। স্বাদ,পুষ্টি,মান বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করা রেসিপি। রোমান শাসকগণ দেশের শ্রেষ্ট পাচকদের রাজ দরবারে ঠাই দেন এবং রান্নাকে শৈল্পিক মর্যাদা দেন। রান্না শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে  বিকশিত রান্নার উপরণ ও যন্ত্রপাতির।মধ্যযূগেই তৈরী হয় দৃষ্টি দৃষ্টি নন্দন  ও সহজ  ব্যবহার উপযোগী তৈজস পত্র । কানাডার টরেন্টওতে র‍্যয়াল অন্টারিয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদূঘর আছে । এ জাদু ঘরের বয়স কম হলেও রোমান সাম্রাজ্যের তৈজসপত্রসহ বিভিন্ন সময়ে্র ্তৈজসপত্র  সংরক্ষণের জন্য  জগত বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ।

বর্তমানে রান্না ও রান্নার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। প্রায় সকল তরিতরকারী কাটার জন্য পৃথক পৃথক যন্র আবিস্কৃত হয়েছে। খাবার গরম ও ঠান্ডা করার যন্ত্র বের হয়েছে।স্বয়ংক্রিয় তাপ নিয়ন্ত্রন,ধুয়া  নিয়ন্ত্রনের যন্ত্র হাতে কাছেই পাওয়া যায় । এক কথায় রান্না শিপ্লে বিপ্লব ঘটেছে।রান্নার জন্য ভাল বেতনে এক শ্রম বাজার সৃষ্টি হয়েছ । বাণিজ্যিক রান্নার ধারণা আজ মুখে মূখে। এখন দেখা যায় ,অনেকে বাসায় রান্না করে না। প্রমাণ হিসেবে গুলশান , বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরার অভিজাত খাবার দোকান গুলোকে হাজির করা যায়। ১০ বছর পূর্বেও বাংলাদেশে সংস্কৃতিতে বিষয়টি কল্পনা করা যেত না। অবশ্য উন্নয়ন পরিমাপক হিসেবে বর্তমানে এটাও বলার সময় এসেছে , যে জাতি যত বেশী রেষ্টুরেন্টে খায় সে জাতি তত উন্নত। আগামীতে আরো চমক আসছে আর তা হলো রান্না , খাদ্য পরিবেশন, থালা বাসন ধোয়ার কাজে রোবটের ব্যবহার।২০১৮ সালের মধ্যে রোবট ব্যবহারের হার বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হছে। জালানী কাঠ, গ্যাস, বিদ্যুৎ এর পরিবর্তে ব্যবহার হবে শৌর শক্তি।

আবার খাবার তালিকা ও আয়তনেও আসছে ব্যাপক পরিবর্তন।এটাও বলা হচ্ছে, একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির দিনে প্রয়োজন প্রায় ২৮০০ ক্যালরী। এ জন্য চাষাবাদ কর, ফসল ফলাও, প্লেট ভর্তি ভাত, মাছ মাংস লও এর প্রয়োজন কী।দৈনিক ৩ বেলা ৯০০ ক্যলোরির ৩ টি ক্যাপসুল খেলেই যথেষ্ট। ক্যাপসুল এর উপাদান কোথায় পাওয়া যাবে।সাগর তলায় সবুজ শ্যাওলায় প্রচুর আছে।ইন্দোনেসিয়া,জাভা সাগর তলে এ উপাদান প্রচুর থেকে প্রচুরচতর পরিমাণে আছে।নিনো ফুডের আলোচনা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। তবে এ নিয়ে বিতর্কও আছে।

বিতর্ক যাই থাকুক না কেন , খাবারের পরিমান বা  আকার যাই হোক না কেন, খাদ্য জীবনের জন্য অপরিহ্যা্র্য। েসখাদ্যের মাধ্যমে আমরা যে ক্যালরী পাই ,তা দিয়ে আমদের জীবন বাচে, আমাদের দেহের অভ্যন্তরের ১০০ বিলিয়ন সেলস সজীব থাকে।

মোঃ আবু বকর সিদ্দীক 

নির্বাহী পরিচালক 

গ্রিন গোল্ড সোসাইটি 

অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা 

 email –siddiquedss@gmail.com

 ২৬শে জুন, ২০১৬ ইং