শুক্রবার  ২২শে জুন, ২০১৭ ইং  |   শুক্রবার  ৯ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ইতিহাসের সাত-সতেরো

জুন ১৬, ২০১৬

ময়মনসিংহ

ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন কাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার রয়েছে এক বর্ণিল ইতিহাস। মহুয়া, মলুয়া, মদিনা, চন্দ্রবতীর লোকগাথা এ অঞ্চলের মানুষকে করেছে আপ্লুত। অনেকে বলেন এ জন্যই ইংরেজদের কাছে এ অঞ্চলকে গর্ব করে পরিচিত করা হয়েছে “আমার মানুষ গান গায়” অর্থাৎ My men sing. এ সময় ময়মনসিংহ পরিচিতি ছিল এক প্রাচুর্যে ভরা অঞ্চল হিসেবে। ফসল তোলার গান ও নবান্ন ঊৎসব মানুষের মনকে করেছে সুধাময়। ময়মনসিংহ জেলা মূলতঃ ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে সৃষ্ট। হিন্দু ধর্মীয় সূত্রে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদ পূর্বে লৌহিত্য সাগর নামে পরচিত ছিল। ঐ সময় বঙ্গদেশের ৩/৪ ভাগ অঞ্চলই লৌহিত্য সাগর গর্ভে নিমজ্জিত ছিল। ৩০২ অব্দে গ্রীক বীর আলেক্সজেন্ডার এর দূত ম্যাগাস্থিনিস ভারত বর্ষে আগমন করেন। তার লেখা পুস্তক ইন্ডিকা থেকে জানা যায়, ময়মনসিংহ কামরুপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। রাজা সমুদ্র গুপ্তের আমলে (৪র্থ শতাব্দীতে )ময়মনসিংহ মগধ রাজ্যের অধীন ছিল। হিউয়েন-সাং এর ভারত ভ্রমন (৬২৯-৬৪৫) কালেও ময়মনসিংহ কামরুপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল । অবশ্য পুরো অঞ্চল কামরুপ রাজ্যের অধীনে আসার পূর্বে কিছু অঞ্চল পুন্ডবর্ধন এর অধীন ছিল। পাল বংশের ৪০০ বছরের শাসন এর মধ্যে প্রথম ১২০ বছর ময়মনসিংহ এ রজ্যের অধীন ছিল। সেন শাসন আমলে ময়মনসিংহ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বংগ এবং কামরুপের অধীন ছিল। তবে এ বিষয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় রামায়ন-মহাভারতে উল্লেখিত প্রাগজোতিষ ( কামরুপ ) প্রভাব বেশী দেখা যায়। রামায়ন-মহাভারতে প্রাগজোতিষের রাজধানী ছিল প্রাগজোতিষপুর যা বর্তমানে ভারতের গৌহাটি নামে পরিচিত। ময়মনসিংহের ইতিহাসে গারো , কচ্চু সম্প্রদায়ের ছোট ছোট নৃপতিদের শাসন দেখা যায়, লম্বোদর নামক সন্যাসীর পুর্বপুরুষগণ সম্রাট জাহাঙ্গীর এর নিকট থেকে পাঞ্জাফরমান এনে খালিয়াজুরি কে ভাটী অঞ্চল নামে শাসন করার ইতিহাস দেখা যায়। ১৩৩৮ সালে সুলতান সেকান্দর সিংহাসন আরহন করেই নিজকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। এর পর ১৭ জন মুসলিম নরপতি স্বাধীনভাভেবে বাংলা শাসন করেন। কিন্ত কেউ ময়মনসিংহ দখল করতে পারেননি। ১৪৯১ সালে ফিরোজ শাহ দিল্লীর সিংহাসন আরোহন করেই ব্রহ্মপুত্র অতিক্রম করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তার সেনানায়ক মজলিস খান শেরপুর এর গডললিপায় দলিল সামন্ত নামক কোচ বংশীয় রাজাকে পরাজিত ও হত্যা করে শেরপুর এলাকায় শাসনভার গ্রহণ করেন এবং প্রথম ময়মনসিংহ জেলার অংশ বিশেষে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। ১৪৯৮ সালে হোসেন শাহ এর রাজত্ব কালে গোটা ময়মনসিংহ জেলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ অঞ্চলের মানুষ ছিল সংগ্রামী তাই ময়মনসিংহ জেলায় বিভিন্ন সময় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, টং আন্দোলন, পাগলা পন্থি বিদ্রোহ, সাধনা সমিতি, অনুশীলন সমিতি ইত্যাদি কর্তৃক আন্দোলন পরিচালনা করার ইতিহাস দেখা যায়। তবে সে সময়ের আন্দোলনের মধ্যে ফকির- সন্ন্যাসী বিদ্রোহ অন্যতম। এ সময় মানুষের পীর ফকির দরবেশ, সন্ন্যাসী ঠাকুর এর প্রতি ছিল অগাধ ভক্তি। উত্তর ভারত থেকে প্রচুর সংখ্যক ফকির দরবেশ সাধু -সন্ন্যাসী এ অঞ্চলে আসতেন, ভক্তদের বাড়ী বা আঙ্গিনায় আস্তানা গাড়তেন। তারা কয়েক মাস থাকতেন। ওয়াজ নসিহত বা ধর্ম কথা শুনাতেন। এক এলাকায় কিছু দিন থাকার পর আবার অন্য এলাকায় যেতেন। প্রচুর উপঢৌকন ও দান-দক্ষিনা পেতেন। ইংরেজরা বিষয়টি সহজ ভাবে নিতে পারে নি। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দেওয়ানী ক্ষমতা লাভ করার পর তারা দেখে জোর জুলুম করেও তারা খাজনাপাতি আদায় করতে পারে না অথচ এ সকল ফকির দরবেশ সাধু -সন্ন্যাসী বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন সংগ্রহ করে নিয়ে যান। এ সময় দেশে ভয়ানক দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ইংরেজগণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার প্রতি অনুকম্পা না দেখিয়ে বরং খাজনার পরিমান বাড়িয়ে দেয়। ফলে মানুষের মধ্যে একটি চাপা ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং শান্তির বাণী শুনতে অধিক হারে ফকির দরবেশ সাধু সন্ন্যাসীদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ফলে ইংরেজগণ তাদের সামনে এ অঞ্চলে ফকির দরবেশ সাধু -সন্ন্যাসী এর আগমন পছন্দ করেনি। ১৭৭১ সালে অকারনে ১৫০ ফকির হত্যা করে। ফলে ফকির দরবেশ সাধু সন্ন্যাসীদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিরোধ স্পৃহা জাগ্রত হয়। ভক্তরা এ ক্ষোভ ও প্রতিরোধ স্পৃহা সমর্থন করে। ফলে ময়ম্নসিংহ জেলা সহ বিভিন্ন এলাকায় শুরু ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। বৃটিস আমলে ১৭৮৭ সালের ১লা মে তারিখে ময়মনসিংহ জেলা স্থাপনের পিছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করে। (ক)ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফকির -সন্ন্যাসী বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করা সম্ভব না হওয়া (খ)নিবিড় ভাবে খাজনা ও কর আদায় করা। তার পর ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী দিয়ে অনেক পানি গড়ায়। পাকিস্তানীদের অত্যাচার ও শোষণের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ময়মনসিংহের মানুষ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আহবানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অকুতোভয় ভূমিকা রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সৃষ্টি করে এক সুবর্ণ ইতিহাস।

কিশোরগঞ্জঃ কিশোরগঞ্জ জেলা ময়মনসিংহ জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। কিশোরগঞ্জ জেলা হওয়ার পূর্বে বত্রিশ নামক এলাকায় বসবাসকারী কৃষ্ণদাস প্রমানিকের পুত্র নন্দ কিশোর ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে একটি হাট বসান। সে সময়ে নদীর তীরে গড়ে উঠা হাট বাজার বা ব্যবসায় কেন্দ্রকে গঞ্জ বলা হত। নন্দ কিশোরের নাম অনুসারে ষষ্ঠ শতকে কিশোরগঞ্জ এর নাম হয়। কিশোরগঞ্জ পূর্বে হোসেনপুর পরগণার অন্তর্গত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ এলাকাটি কিশোরগঞ্জ অপেক্ষা কাঠখালী নামে অধিক পরিচিত ছিল। সম্রাট আকবরের সময় সমগ্র কিশোরগঞ্জ মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। ১৭৮৭ সালের পহেলা মে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠার পর কিশোরগঞ্জ ময়মনসিংহ জেলার অধীনে আসে। প্রথম মহকুমা প্রশাসকের নাম জনাব বক্সেল। প্রাচীনকালে কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর, নিকলি, হোসেনপুর, জঙ্গলবাড়ি নানা ইতিহাসে সম্বৃদ্ধ ছিল। এ অঞ্চলে গুপ্ত, বর্মন, পাল ও সেন বংশ রাজত্ব করে। কিন্তু কেউই পুরো কিশোরগঞ্জকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। তবে জংগলবাড়ি তখন অন্যান্য ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী ছিল। ১৮৬০ সালে মহকুমা সৃষ্টির সময় কিশোরগঞ্জের মাত্র ৩টি থানা ছিল। এগুলো হচ্ছে নিকলি, বাজিতপুর ও কিশোরগঞ্জ। বর্তমানে উপজেলার সংখ্যা ১৩ টি। কিশোরগঞ্জ জেলায় খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের ব্যাপক বিস্তৃতি আদিকাল থেকেই ছিল। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী এ অঞ্চলের সন্তান। ময়মনসিংহ গীতিকার ৪৪টি গাথার মধ্যে অধিকাংশই কিশোরগঞ্জের মাটি ও মানুষের জীবনালেখ্য নিয়ে তৈরি। ব্রিটিশ আমলে যারা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সারা ভারতবর্ষ কাপিয়েছেন তাদের মধ্যে মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ, ব্যারিষ্টার ভূপেশ গুপ্ত, নগেন সরকার, বিবরেণ চক্রবর্তী, জমিয়ত আলী, গণেশ সরকার, ওয়ালী নেওয়াজ খান, রেবতী বর্মন নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পসাহিত্যে জয়নুল আবেদীন, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সত্যজিৎ রায়, সুকুমার রায় এর নাম নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে কিশোরগঞ্জবাসীর ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় সমুজ্জ্বল। প্রয়াত অস্থায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এ জেলার বরেণ্য সন্তান। বর্তমানে এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে সর্ববৃহৎ ঈদগাহ মাঠ শোলাকিয়া কিশোরগঞ্জ জেলার পরিচিতিকে ভিন্ন মাত্রা প্রদান করেছে।
নেত্রকোনাঃ চাদের আলো, মিষ্টি হাওয়া এবং জলতরঙ্গের এক অদ্ভুত সমাহারে সমৃদ্ধ নেত্রকোনা জেলা। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে এ অঞ্চল গুপ্ত সম্রাটগণের অধীন ছিল। নেত্রকোনা তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কালিগঞ্জ থানার অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে নেত্রকোনা জেলার নাটরকোনাতে মহকুমা স্থাপিত হয়। নাটরকোনা ইংরেজগণ কর্তৃক বিকৃত উচ্চারণের মাধ্যমে নাট্রকোনা পরবর্তীতে নেত্রকোনা নামে পরিচিতি লাভ করে। আবার এটাও বলা হয়ে থাকে নেত্রকোনা শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত মগরা নদীর বাক সুন্দরী মহিলার মন হারানো কাজল দেয়া অপরূপ চোখের বাকের মত দেখতে ছিল বলে এই শহরের নাম হয় নেত্রকোনা। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দুরাজা শশাংকের আমন্ত্রনে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এই অঞ্চলে আগমন করেন। তখন এই অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে নেত্রকোনা জেলার পাহাড় অঞ্চল বৈশ্য গারো এবং দুর্গা গারো এরা রাজত্ব করতেন। চতুর্থ শতাব্দীতে জিতারা নামক একজন সন্ন্যাসী নেত্রকোনা জেলার ভাটি অঞ্চল আক্রমণ ও শাসন করেন। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। সোলাইমান খার জ্যেষ্ঠ পুত্র ঈশা খা খিজিরপুর থেকে এ অঞ্চল শাসন করে। ১৫৯৯ সালে ঈশা খায়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র মুসা খা এবং আফগান সেনা খাজা ওসমান খা কর্তৃক এ অঞ্চল শাসিত হয়। নেত্রকোনা জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। এখানে মানুষের মন হাওড়ের খোলা আকাশের মত উদার ও নির্মল। মগরা, কংশ, সোমেশ্বরী, গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য মানুষের হৃদয় কে করে বিমোহিত। এ জেলায় দেখার মত জায়গা হচ্ছে বিজয়পুর পাহাড়ে চিনামাটির নৈসর্গিক দৃশ্য, টং আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ, রাণীখং মিশন টিলাতে ক্যাথলিক গির্জা, বিরিশিরি কালচারাল একাডেমী, কমলা রাণীর দীঘি, কথিত নইদ্যা ঠাকুরের ভিটা, রাশমণি স্মৃতি সৌধ, লেগুরা, চেংটি, গোবিন্দপুরের পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য, সাত শহীদের মাজার, হযরত শাহ সুলতান কমরউদ্দিন রুমী (রাঃ)-এঁর মাজার শরীফ, রোয়াইলবাড়ীর পুরার্কীতি। এ অঞ্চলের বিখ্যাত সংগ্রামী পুরুষ কমরেড মণি সিংহ, কমরেড মৃণাল কান্তি বিশ্বাস, নলিনীরঞ্জন সরকার প্রমুখ। কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে কাহ্নপা, কবি কঙ্কণ, চন্দ্র কুমার দে, মনসুর বয়াতি, হুমায়ূন আহমদ, নির্মলেন্দু গুণ, ডঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবাল অন্যতম। বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এই অঞ্চলের সন্তান।
টাংগাইলঃ টাংগাইল জেলা যমুনা নদী বিধৌত একটি নিচু অঞ্চল। জনশ্রুতি আছে, নিচু অঞ্চলের জমি উঁচু ( টান ) আইল দিয়ে ঘিরে সেখানে চাষাবাদ করা হত।তাই টান আইল থেকে টাঙ্গাইল জেলার নামকরণ করা হয়। আবার সেসময় ঘোড়ার গাড়িকে টাংগা বলা হত এবং এ গাড়িগুলো আইলের উপর দিয়ে চলত। তা থেকেও টাংগাইল শব্দ আসতে পারে। পূর্বে এ অঞ্চলের নাম ছিল আটিয়া। ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত রেনেলের মানচিত্রের আটিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮৮৬ সালে ১৫ নভেম্বর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইল এ মহকুমা স্থাপন করা থেকে টাঙ্গাইল এর পরিচিতি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। টাংগাইল অঞ্চলটি ছিল সে সময় ব্যাপকভাবে সম্বৃদ্ধ। ভারতবর্ষ বিভাগের পূর্বে বলা হত “মাইমেন্সিং উইথ আউট টাঙ্গাইল ইজ ইকুয়েল টু জিরো” । ১৯৬৯ সালে টাঙ্গাইল মহকুমাকে ময়মনসিংহ হতে পৃথক করে পৃথক জেলায় রূপান্তর করা হয়। টাংগাইল জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হচ্ছে মহেড়া জমিদারবাড়ী, দেলদুয়ারের আতিয়া মসজিদ, নাগরপুরের উপেন্দ্র সরোবপাকুটিয়ার জমিবারবাড়ি, এলেঙ্গা রিসোর্ট , ধলাপাড়া চৌধুরীবাড়ী ও কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ইত্যাদি। টাঙ্গাইল জেলার বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ধর্মপ্রচারক ও পীর আলী শাহান শাহ্ বাবা আদম কাশ্মিরী, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও সুশাসক শাহজামান, নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, নওশের আলী খান ইউসফজি, স্যার আবদুল করিম গজনবী, রজনীকান্ত গুহ, মন্মথনাথ রায় চৌধুরী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, রণদা প্রসাদ সাহা, বেগম ফজিলাতুন্নেছা, হাতেম আলী খান, যাদুসম্রাট পিসি সরকার, ডঃ এম এন হুদা, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী নাম উল্লেখযোগ্য। টাংগাইল জেলায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে ভূমিকা রাখে তা গোটা জাতির নিকট স্মরণীয়।
জামালপুরঃ জামালপুর জেলা সম্রাট আকবরের আমলে আগত সাধক পুরুষ হযরত শাহ জামাল ( রহ.) এর নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ইয়েমেন থেকে ২০০ জন অনুসারী নিয়ে এ অঞ্চলে আগমণ করেন। জামালপুর জেলার স্বাধীনতা সংগ্রামে রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। জামালপুর জেলার পশ্চিমাঞ্চল নদী ভাঙ্গন ও বন্যা প্লাবিত হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষকে করতে হয় ব্যাপক সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার লড়াই। জামালপুর জেলার যমুনা নদীর অংশ পেরুয়া নামে খ্যাত ছিল এ নদীর রুই মাছ এর স্বাদ এবং আকার সারা ভারত বর্ষে দেশে পরিচিত ছিল। পুরো নদীতে জাল পেতে দুপাড় থেকে মোটা কাছি (রশি) দিয়ে টানা হত। এ জাল পানির উপরেও প্রায় ৭-৮ ফুট উচু করে টানানো হত। রুই মাছ সময় সময় লাফ দিয়ে এ জালও ডিঙ্গিয়ে যেত। জ্যোৎস্না রাতে মাছ লাফিয়ে অনেক সময় চলন্ত নৌকাতে পড়ত এবং কেউ কেউ আহতও হত। এ দৃশ্যের কথা সরিষাবড়ি অঞ্চলের প্রবীণ ব্যক্তিরা এখনও গল্প করে নাতিপুতিকে শোনায়। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ির জুট মিলগুলো ভারতের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এ জুট মিলগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। তবে সম্প্রতি সরিষাবাড়ীর কান্দারপাড়া-তারাকান্দিতে প্রতিষ্ঠিত যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি এ অঞ্চলকে পুনরায় হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। বর্ষাকালে এ যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত গ্রামগুলোর মনহারা রূপ মানুষকে বিমোহিত করে। এ অঞ্চলের খ্যাতিমান ব্যক্তিগণের তালিকায় রয়েছেন নাটকে বাংলার মুকুট বিহীন সম্প্রাট আনোয়ার হোসেন, জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত নাট্যকার আমজাদ হোসেন, প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব আব্দুল্ল্যাহ আল মামুন , বিখ্যাত গীতিকার ও শিল্পী মরহুম নজরুল ইসলাম বাবু, নাট্যকার মরহুম এম এস হুদা ও গিয়াস মাস্টার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনাকারী মরহুম হাসান হাফিজুর রহমান, মরহুম প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল জব্বার, মরহুম আ: ওয়াদুদ মাস্টার,মরহুম প্রিন্সিপাল রইছ উদ্দিন, মরহুম আশেক মাহমুদ তালুকদার, মরহুম নঈম মিয়া, স্বর্গীয় নলিণী মোহন দাশ মাখন বাবু, শ্রী বঙ্কিম বিহারী রাউৎ, মরহুম আব্দুর রহিম তালুকদার, ভাষা সৈনিক মরহুম এডভোকেট আনোয়ারুজ্জামান, মরহুম কাদা মিয়া, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্ণর ড. আতিউর রহমান, সচিব গোলাম রববানী, মরহুম আব্দুর রশিদ, মরহুম মজিবর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ প্রমূখ।
শেরপুর: শেরপুর জেলা পুর্বে লোহিত্য সাগর গর্বে নিমজ্জিত ছিল বলে জানা যায়। পরে শেরপুর জেলা সাগর গর্ব হতে জেগে ঊঠার পরও মাঝখানে নদী রয়ে যায়। নৌকায় ঊভয় পাড়ে পারাপারের জন্য বছরে দশ কাহন (কড়ি) ইজারাদার কে দিতে হতো। এ জন্য এ অঞ্চলের নাম হয় দশ কাহনীয়া। নবাবী আমলের শেষ জমিদার শের আলী গাজী দশ কাহন দখল করে স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করেন। তার নাম অনুসারে দশ কাহনীয়ার নাম হয় শেরপুর। জমিদার আমলে ১৮৬৯ সালে শেরপুর পৌর সভা হয়। শেরপুর জেলার মানুষের মধ্যে সব সময়ই একটি সংগ্রামী মনোভাব দেখা যায়। পাগল পন্থী নেতা টিপু পাগল কিছুদিনের জন্য বৃটিশদের পরাজিত করে স্বাধীন ভাবে এ অঞ্চল শাসন করেন। ফকির বিদ্রোহ, টংগ আন্দোলন, নানকার আন্দোলন, আদিস্থান আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সব ক্ষেত্রেই শেরপুর এর ভুমিকা অনন্য। শেরপুর জেলা ছিল খেলোয়ার দের তীর্থ ভূমি। নৌকা বাইচ, ঘোড় দৌড়, বলদের দৌড়, হাডু ডু, মহহেলদার , লাঠি খেলা, তলোয়ার খেলায় শেরপুরবাসী বিশেষ পারদর্শী। শেরপুর জেলার দর্শনীয় স্থান সমুহের মধ্যে গজনী মধুটিলা ইকোপার্ক, শের আলী গাজীর মাজার, জরিপ শাহ এর মাজার, শাহ কামাল এর মাজার, বার দুয়ারী মসজিদ, ঘাগড়া লস্কর খান মসজিদ, মাইসাহেবা জামে মসজিদ, পানি হাটা দীঘি, নয়াআনী বাজার নাট মন্দির, রঘুনাথ মন্দির, জিকে পাইলট স্কুল, গড়দলিপা কালিদহ গাং এর ডিঙি অন্যতম। শেরপুর জেলা ছিল ধনে-ধান্নে সমৃদ্ধ। শেরপুর জেলায় টাকায় ১ মণ ধান পাওয়া যেত। নেতাজি সুভাস বোস, এ কে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রাহমান শেরপুর আগমন করে এ অঞ্চলের মানুষকে গর্বিত করেছেন। শেরপুরে কৃতি ব্যাক্তিত্বের মধ্যে ভাষা সৈনিক অধ্যক্ষ আবুল কাশেম, বিপ্লবী রবি নিয়গি, শের আলি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আতিউর রহমান আতিক, হযরত শাহ কামাল (র:) ও কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

তথ্যসূত্র ইন্টারনেট ও ইতিহাস।

মোঃ আবু বকর সিদ্দীক 

নির্বাহী পরিচালক 

গ্রিন গোল্ড সোসাইটি 
e-mail-siddiquedss@gmail.com