শনিবার  ২৯শে এপ্রিল, ২০১৭ ইং  |   শনিবার  ১৬ই বৈশাখ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

তুরস্কে বিমানবন্দরে হামলা নিহত ৪২ ! বিশ্বনেতাদের নিন্দা।

জুন ৩০, ২০১৬

turky blast

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ৪২ জন নিহত ও প্রায় ২৫০ জন আহত হয়েছে। জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) মঙ্গলবার মধ্যরাতে এ হামলা চালিয়েছে বলে তুরস্ক সরকার ধারণা করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘যৌথ প্রতিরোধের’ আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তাঁর দেশের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান জন ব্রেনানও এ হামলার জন্য আইএসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ওবামাসহ বিশ্বনেতারা ঘটনার নিন্দা করে তুরস্ককে সহানুভূতি জানিয়েছেন। গতকাল রাত পর্যন্ত এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি কেউ।
রক্তক্ষয়ী আকস্মিক হামলার এ ঘটনায় হতবাক ও শোকে মূহ্যমান তুরস্ক। দেশটিতে গতকাল বুধবার জাতীয় শোক পালন করা হয়। এই বছরে তুরস্কে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী হামলায় কমপক্ষে ১৩২ জন নিহত হয়েছে।

হামলার পর এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, ‘যদি রাষ্ট্রগুলো তাদের মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর
বিরুদ্ধে প্রতিরোধসংগ্রামে অংশ না নেয়, তবে আমাদের মনের ভেতরে থাকা আশঙ্কাগুলো একে একে বাস্তবে রূপ নেবে।

এরদোয়ান আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই হামলা ক্রান্তিলগ্ন হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। আজ ইস্তাম্বুলে বোমা হামলা হয়েছে, আগামী দিনে বিশ্বের যেকোনো শহরের যেকোনো বিমানবন্দরে এ ধরনের হামলা হতে পারে।

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম বলেছেন, এই হামলার পেছনে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, হামলার ধরন ও গতিপ্রকৃতি আইএসের দিকে ইঙ্গিত করে।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮ জন তুরস্কের নাগরিক। ৫ জন সৌদি আরবের ও ২ জন ইরাকের নাগরিক। এ ছাড়া চীন, জর্ডান, তিউনিসিয়া, ইরান, ইউক্রেন ও উজবেকিস্তানের ১ জন করে নাগরিক নিহত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

তুরস্কের কর্মকর্তারা বলেন, হামলায় অংশ নেয় কমপক্ষে তিনজন। তারা একটি ট্যাক্সিতে করে এসে বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল লাউঞ্জের প্রবেশপথে নির্বিচারে গুলি শুরু করে। পুলিশ তাদের ওপর পাল্টা হামলা চালালে হামলাকারীরা সঙ্গে থাকা বোমা ফাটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিও চিত্রে কমপক্ষে দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা দেখা যায়। গুলির শব্দ এবং পরে বিস্ফোরণে সৃষ্ট আগুনের গোলা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। আরেকটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, কালো পোশাকে আবৃত একজন হামলাকারী বিমানবন্দরের ভেতরে দৌড়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ার আগে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে অনলাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ছবিতে বিমানবন্দরের মেঝেতে এবং টার্মিনাল ভবনের বাইরে আহত ব্যক্তিদের পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা: দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক পল রুস দেশে ফিরতে একটি উড়োজাহাজে ওঠার অপেক্ষায় বিমানবন্দরে ছিলেন। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি একজন হামলাকারীকে দেখেছি। লোকটির সব পোশাকই কালো রঙের। তবে সে মুখোশ পরা ছিল না। আমরা একটি কাউন্টারের আড়াল থেকে তাকে দেখছিলাম। সামান্য বিরতিতে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। ততক্ষণে লোকটি গুলিবর্ষণ থামিয়ে দেয়। তারপর ঘুরে আমাদের দিকে এগোতে শুরু করে। বন্দুকটা তখন তার জ্যাকেটের ভেতরে ভরা ছিল। লোকটা উদ্বিগ্নভাবে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছিল, কেউ তাকে বাধা দিতে আসে কি না। তারপর সে সিঁড়ির দিকে চলে যায়। এরপর আমরা কয়েকটি গুলির শব্দ শুনি এবং আরেকটি বিস্ফোরণ হয়। এভাবেই ঘটনার শেষ হয়।

হামলার সময় বিমানবন্দরে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। লোকজন দিগ্‌বিদিক দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। হামলার পর বিমানবন্দরে সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী জানান, ১২ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে। এর আগে গত মার্চে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে বিমানবন্দরে অনুরূপ সন্ত্রাসী হামলার পর সেটি ১২ দিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। ওই ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়।
গতকালের হামলাকারী ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তদন্তকারী ব্যক্তিরা বিমানবন্দরের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা, যাত্রীদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও চিত্র এবং তাঁদের বক্তব্য নিয়ে হামলাকারী ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছেন।

সম্প্রতি তুরস্কে যে কয়টি বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশের পেছনে হয় আইএস, নয় কুর্দি যোদ্ধাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। সাধারণত তুরস্কে কুর্দি বিদ্রোহীদের হামলার লক্ষ্য হন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। বিবিসির বিশ্লেষক বলেছেন, বেশ কয়েক ঘণ্টা পরও কেউ দায় স্বীকার না করায় অবাক হওয়ার কারণ নেই। কারণ, তুরস্কে এ ধরনের হামলার ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইএস দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয়নি। এই বিশ্লেষক বলেন, আইএস তুরস্কের সরকারকে অনৈসলামিক ও পশ্চিমাঘেঁষা মনে করে।

বিশ্বনেতাদের নিন্দা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ হামলার ঘটনায় দায়ী হিসেবে আইএসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কানাডার রাজধানী অটোয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার শীর্ষ সম্মেলনের এক ফাঁকে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তুর্কি জনগণের পাশে আছে। ঘটনার সাক্ষ্য-প্রমাণ আইএসের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্দোষ লোকজনের হত্যাকারী এই জঘন্য সংগঠনগুলো ক্রমাগত পায়ের নিচে মাটি হারাচ্ছে।

জার্মানি থেকে একই ধরনের ঘোষণা এসেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তুরস্কের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। সন্ত্রাস-উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক তৎপরতা জোরদার করার কথা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

একের পর এক হামলা: এই বছরে তুরস্কে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী হামলায় কমপক্ষে ১৩২ জন নিহত হয়েছে। মঙ্গলবারের হামলায় এ বছরের সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়। ১২ জুন সিরিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলায় ১২ জন জার্মান নিহত হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি আঙ্কারায় সামরিক এলাকায় হামলায় ২৯ জন নিহত হয়। কুর্দি বিদ্রোহীরা হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে। ১৩ মার্চ আঙ্কারায় গাড়িবোমা হামলায় ৩৫ জন মারা যায়। কুর্দি বিদ্রোহীরা এই হামলার দায়ও স্বীকার করে। ১৯ মার্চ ইস্তাম্বুলে আইএসের আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয় ৪ জন। ৭ জুন ইস্তাম্বুলে কুর্দি বিদ্রোহীদের গাড়িবোমা হামলায় পুলিশের ৭ সদস্যসহ ১১ জন নিহত হয়।

ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তুরস্কের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর। এটি ইউরোপের তৃতীয় এবং বিশ্বের ১১তম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ২০১৭ সালের মধ্যে দেশটিতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিমানবন্দর নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। তখন এই বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। সূত্র- বিবিসি।

ই বাংলা পত্রিকা/ আন্তর্জাতিক ডেস্ক- ০৬/৩০/২০১৬