মঙ্গলবার  ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং  |   মঙ্গলবার  ২রা কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

এইমাএ পাওয়া

ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে গোপালগঞ্জের কামার শিল্পীরা

সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৬

গোপালগঞ্জের কামার শিল্পীরা

।। এম শিমুল খান /গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি ।।

গোপালগঞ্জে গ্রামীণ প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প নানা সংকটে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, কারিগরদের মজুরী বৃদ্ধি, তৈরি পণ্যসামগ্রী বিক্রয় মূল্য কম, কয়লার মূল্য বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্টীল সামগ্রী আমদানি সহ চরম আর্থিক সংকট ও উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম থাকায় ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে গোপালগঞ্জের কামার শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে।

কোরবানীর ঈদ তাই ভাঁতির ফাসফুস আর হাঁতুড়ি পেটার ঠুক ঠাক, টুং টাং শব্দে মুখর এখন কামারশালাগুলো। কুরবানির পশুর মাংস কাঁটাকাটি আর চামড়া ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত চাপাতি, দা, ছুরি, বটিসহ কিছু ধারালো জিনিস তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এ সব ধারালো অস্ত্র চাহিদা মতো সরবরাহে কামার শিল্পীরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। ঈদ যত কাছে আসবে বিক্রি ততো বেশি হবে বলে জানান কামার শিল্পীরা। ঈদুল আজহার অন্যতম পশু জবাই করা। আর জবাই করার অন্যতম উপাদান এসব পণ্য। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে কুরবানির সময়টাতে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে বেড়ে যায় তাদের আয়-রোজগারও। তাদের বছরে দুর্দিন থাকলেও এখন সুদিন।

ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাট বাজারের কামাররা দেশী প্রযুক্তির দা, কুরাল, বেকি, খুন্তা ও কাটারী বানাতে বেশ উৎসব মুখর ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। হাট-বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই গ্রামের লোকজন গরু, ছাগল জবাই ও মাংস তৈরির কাজের জন্য কামারীদের কাছে তাদের প্রয়োজনীয় ধারালো দেশী তৈরী চাকু, বটি, কাটারি ও ছুরি তৈরীর আগাম অর্ডার দেওয়া শুরু করায় কামার পল্লী গুলোতে টুং টুং শব্দে এখন মুখরিত। ঘুমাতে পারছে না পাশের বাড়ির মানুষগুলো।

আধুনিকতার উৎকর্স, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে নানাবিধ সমস্যার কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের গ্রাম-বাংলার মানুষের প্রিয় শিল্পটি। এক সময় গোপালগঞ্জ জেলাসহ ৫টি উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক কর্মকার পরিবার থাকলেও তাদের তৈরি পণ্যসামগ্রী প্রযুক্তির ছোঁয়ার কাছে টিকে থাকতে না পারায় বেশ কিছু পরিবার তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে পরিবারের অভাব-অনটন ও চাহিদার তাগিদে লাভজনক অন্য পেশায় চলে গেছে। বর্তমানে জেলার ৫টি উপজেলা ও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় শতাধিক পরিবারের কর্মকাররা তাদের পৈত্রিক পেশা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে হলেও দু’মুঠো ভাতের আশায় তারা এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। যত টুকু লাভ হোক না কেন কোন রকম দিন চললেই তারা বেজায় খুশি অন্য পেশায় যেতে তারা একদম নারাজ।

গোপালগঞ্জ জেলা সদরসহ প্রতিটি হাট-বাজারে ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে কামার কারিগররা সারা বছরের তুলনায় বর্তমানে রাত দিন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এখানকার কামারদের নিপুন হাতে তৈরি বটি, ছুরি, কাটারি, দা, বেকি, কুঠার, খুন্তা ও লাঙ্গলের ফলাসহ বিভিন্ন ধরণের যাবতীয় প্রয়োজনীয় লৌহজাত দ্রব্য তৈরি করেন।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার কার্তিক কর্মকার ও সূর্য কর্মকার জানান, লোহা পিটিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা আমাদের পেশা, বাপ-দাদার পৈত্রিক সূত্রে আমরা এই পেশায় জড়িত। একটি মাঝাড়ি ধরণের দা ও কাটারি তৈরি করে ওজন অনুযায়ী ২শ ৫০ টাকা থেকে ৩শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হয়। সাড়া দিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যে কয়টি জিনিস তৈরি করি তা বিক্রয় করে খুব বেশি লাভ না হলেও পরিবার-পরিজন নিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার স্বার্থে আদি এই পেশা আমরা ধরে রেখেছি। তবে সারা বছর কাজ-কর্মের ব্যস্ততা তেমন না থাকলেও কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে আমাদের কর্ম ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সাড়া বছর এই রকম কাজ থাকলে ভালই হত।

গোপালগঞ্জের যোতিষ চন্দ্র কর্মকার জানান, আমার বাপ-দাদার মূল পেশা ছিল এটা। তারা গত হওয়ার পর ওই সূত্র ধরে আমার জীবনেরও শেষ মূহুর্তে এই পেশা ধরে রেখেছি। সাড়া দিন চাকু, বটি তৈরি করে যা আয় হয় তা দিয়েই পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে বাচি। কেন না এই পেশা ছেড়ে অন্য কোন ভাল পেশায় যাব এই রকম আর্থিক সংগতি আমার নেই। তবে সরকারি ভাবে এবং এনজিওর মাধ্যমে আমাদের কামাদেরকে সুদ মুক্ত ঋন দিলে পাইকারি মূল্যে উপকরণ কিনতে পারলে অবশ্যই এই দেশীয় কামার শিল্প পূর্বের ন্যায় ঘুরে দাড়াবে।

এক সময় এলাকার মানুষের ঘুম ভাঙতো কামারের হাতিয়ারসহ অন্যান্য লোহার উপকরন তৈরীর ঠুং ঠাং শব্দের সাথে। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। এই শিল্প হারিয়ে না যায় সেজন্য সরকারের সহযোগিতা ও ঋণের প্রত্যাশা করেন তিনি।
মঙ্গলবার৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ইং